Breaking News
Home / নীড় / জাপানীরা কেমন ( পর্ব – ৩৭ ) আরশাদ উল্লাহ্‌

জাপানীরা কেমন ( পর্ব – ৩৭ ) আরশাদ উল্লাহ্‌

ডেস্ক রিপোর্ট
Arshadullah

গ্রামাঞ্চলে জাপানের অধিকাংশ বসত বাড়ি কাঠের তৈরী । ছোটবড় কাঠের বাড়িগুলির মধ্যে নব্বই ভাগ মাঝারি আকৃতির দু’তলা ঘর। বাকিগুলি বড় আকৃতির বসত বাড়ি। এই বড় বাড়িগুলির অধিকাংশ হল কৃষকের। বড় বসত ঘরের পাশে ছোট আকৃতির একটি বা দুটি ঘর থাকলে বুঝতে হবে এই বাড়িগুলি ধনী কৃষকদের। আমি যে শহরটিতে থাকি এই শহরে কয়েকটি ঘর কৃষকের। বাকি ঘরগুলিতে চাকুরীজীবী ও মধ্যম শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা থাকেন। শাকসবজি করার জন্য এক খন্ড জমি একজন কৃষকের কাছ থেকে দুই বৎসরের জন্য পত্তন নিয়েছি। চাষ করার পদ্বতি ভাল জানি না, যন্ত্রপাতিও নাই দেখে কৃষকটি মাঝে মাঝে আমাদের কিছু কিছু শিখিয়ে দেন। যুদ্ধের সময় যুদ্ধ বিমান তৈরীর কারখানাতে চাকুরী করেছেন। যুদ্ধ বিমানের এঞ্জিনের উপর তার বেশ জ্ঞান রয়েছে। একদিন সিংগল প্রপেলার যুদ্ধ বিমানের এঞ্জিনের শক্তি কতটুকু ছিল বুঝিয়ে বলেছিলেন। তার বাড়িটি আমার বাসা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে। কিন্তু কোনদিন আমি তার বাড়িতে যাইনি। যেদিন পত্তনের কাগজ লিখেছি সেদিন তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। বিশাল বাড়ি। কমপক্ষে এক হাজার বর্গমিটার হবে তার বাড়িটির আয়তন। যুদ্ধ বিমান এঞ্জিন এর উপর আমাকে ধারণা দিলেও – তিনি কিন্তুডিগ্রীপ্রাপ্ত ইঞ্জিনীয়ার নন। হাই স্কুল পাশ করা সেকেলে সাধারণ একজন লোক। কিন্তু তার মেধাশক্তি যে ব্যাপক সেদিন তার কথা শুনে বুঝেছিলাম। আজ থেকে চার বৎসর পূর্বের কথা। বর্তমানে তার বয়স অষ্টাশি। বয়স বেশি, কিন্তু এখনো মোটর সাইকেলে চলাফেরা করেন। দেহের চামড়ায় অনেকগুলি ভাঁজ, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টির প্রখরতা কমেনি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি কৃষি কাজে মনোনিবেশ করেন। এই বৃদ্ধ কৃষকটির নাম নিশিদা। জমি পত্তন নেয়ার পর অনেকবার তার ঘরে গিয়েছি। বাংলাদেশ থেকে মরিচ, ধন্যা, পুঁইশাক, ডাটা, লাউ, মিষ্টি কুমড়া ও আরো কয়েক প্রকার সবজীর বীজ এনেছি। তিনি আমাদের কাছ থেকে কিছু বীজ চেয়ে নিয়ে নিজেও পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। ঘরের সামনে তার প্রচুর খালী জমিন। সেগুলিতে যত্নের সাথে বিভিন্ন প্রকার সবজী করেন। নিশিদার মস্তবড় দু’তলা ঘরে যতবার গিয়েছি ততবার তার বাষট্রি বৎসর বয়সের পুত্রটিকে দেখেছি। প্রথম দেখার পর তিন বৎসর অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন তার পুত্রটি চাকুরি থেকে অবসর প্রাপ্ত একজন পেনশন ভোগী নাগরিক। নিশিদা ও তার পুত্র ছাড়া তৃতীয় কোন বান্দা তার ঘরে আমার নজরে পড়েনি। কিন্তু আমার স্ত্রী বলেছে যে ঘরে নিশিদার স্ত্রী আছেন। বিগত তিন বৎসরে বার তের বার বিভিন্ন কাজে কথা বলতে গিয়েছি। তার ঘরে তৃতীয় কোন ব্যক্তির উপস্থিতি বুঝতে পারি নি।  তার স্ত্রী দেখতে কেমন তাও জানি না।

সাতো নামে একটি লোক পাশের শহরে থাকে। বয়স ছিষট্রি বৎসর। মাঝে মাঝে নিশিদা সানের বাড়িতে আসা যাওয়া করে। সাতো সান ভূমিহীন একজন মজুর। কেউ কাজের কথা বললে করে দেয়। তাছাড়া আগে সে কোথাও কাজ করতো আমার ধারণা। এখন সামান্য পেনশন পায়। পরশু সাতোর সাথে আমার হাঁটার পথে দেখা। সে ছোট এক রুমের একটি সস্তা এপার্টমেন্টে থাকে। তার স্ত্রী নেই।শক্ত সামর্থ লোক। এই বয়সেও তার দেহে বল আছে। অনেক ভারি কাজ সে করতে পারে। সাতোর এক কোরিয়ান স্ত্রী ছিল। এক বৎসর সংসার করার পর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। সাতোর বক্তব্য হল তার কলেজ পাশ কোরিয়ান সুন্দরী স্ত্রীটি নাকি ভিসার জন্য তাকে বিয়ে করেছিল। তার ঘর করার জন্য নয়। ভিসা পাওয়ার পর তালাক হয়ে গেছে। ক্ষুব্ধ হয়ে একদিন বলল, “শুধুমাত্র তালাক দিয়ে চলে যায় নি। সে আমার সর্বনাশ করে গেছে। তালাকের ক্ষতিপূরণ দুই মিলিয়ন ইয়েন ( পনের লক্ষ টাকা ) তাকে দিতে হয়েছে।”

যেদিন তার সাথে দেখা হয়, দুঃখ করে আমাকে বলে যে তার কোরিয়ান স্ত্রী  প্রতারণা করেছে।  একথাটি সে অনেক বার আমাকে বলেছে। আমি তার কথা শুধু শুনতাম কোন মন্তব্য করি নি।

একদিন আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, “তুমি তো কোন মন্তব্য করলে না। আমার দুঃখের শরীক হতে তোমাকে বলছি না। তোমার কি ধারণা তাতো বলবে?”

বললাম, “তুমি বোকা বলে সে প্রতারণা করেছে!”

“কি বললে, আমি বোকা?”

বললাম, “হ্যাঁ, তুমি বোকা!”

সহজ সরল লোক এই সাতো সান। শহরের এক দরীদ্র পরিবারে তার জন্ম। স্কুলে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে।  তার সঙ্গি হল দু’টি  জার্মন ‘দাচ্‌হুন্ড’ ছোট পা ওয়ালা কাল বর্ণের কুকুর। জীবনে এক চিলতা জমিন কিনে একটি ঘর করতে পারেনি কিন্তু সে দামি কুকুর পালে। একদিন তাকে বললাম, “তুমি যে বোকা তার প্রমাণ চাও?”

“হ্যাঁ, আমি কেন বোকা হব, প্রমাণ দাও তো?”

বললাম, “যাকে বিয়ে করেছ সেই যুবতী মেয়েটি কলেজ পাশ করা। তোমার বয়সের সাথে অনেক তফাৎ রয়েছে। মেয়েটি পরিকল্পনা করে দালালের মাধ্যমে তোমাকে বিয়ে করেছে। তার মনে মতলব ছিল যে যখন তার ভিসা সমস্যার সমাধান হবে – তখন চলে যাবে। একথাটি তুমি কেন বুঝ নি?”

“না, বুঝিনি তো।” সাতো চোখ কপালে তুলে বলল।

“ঘটকালি করেছে কে?” জিজ্ঞাসা করলাম।

“একটি ঘটকালি কোম্পানীর দালাল!”

“তাহলে ঐ দালালটি মেয়েটির কাছ থেকেও টাকা নিয়েছে। তোমার কাছ থেকে কত নিয়েছে?”

সাতো সান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “পাঁচ লক্ষ ইয়েন ( সাড়ে তিন লক্ষ টাকা)।”

সময়ের বিবর্তনে মানুষ বদলে যায়। দেশে যখন অর্থনৈতিক মন্দাবস্তা দেখা দিল তখন আমার অনেক চেনা জানা লোক দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেলো। তাদের নিয়ে রেষ্টুরেন্টে বছরে একবার নববর্ষের পার্টি করেছি। সুন্দরী যুবতিদের পার্টির অতিথিদের সেবা করার জন্য টাকা দিয়ে চুক্তি করে আনতো। তারা কিমনো পড়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখে অতিথি সেবা করত। এমন সুন্দরী মেয়েদের সরবরাহ করতো “প্রমোশন” কোম্পানী নামে এক ধরণের কোম্পানী। সে-সব কোম্পানী পার্টি, বিবাহ অনুষ্ঠান ছাড়াও অন্যান্য অনুষ্ঠানে বেশি টাকা নিয়ে যুবতিদের সরবরাহ করে। অর্ধেক টাকা মেয়েটিকে দিয়ে বাকি টাকা কোম্পানী নিয়ে নেয়। এখনো এমন কোম্পানী বিভিন্ন শহরে আছে। ঐ সব পার্টিতে নব্য ধনীরা যুবতিটিকে অনেক টাকা বকশিস দেয়। এখন ধনীদের সঙ্খ্যা কম। তাই সে ধরণের পার্টি কমে গেছে। অনেকের পকেটে পয়সা নেই। বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ জাপানের বিবর্ণ চেহারা সর্বত্র দেখা যায়। তা সনাক্ত করতে হলে অনেক দোকানের শাটার যে চব্বিশ ঘন্টায় খুলা হয়না সেগুলি দেখলেই বুঝা যায়।  সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল শিশুদের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। কারণ যুবক যুবতিরা বিয়ে করে না। সন্তান সংখ্যাও বাড়ে না। তবে তারা ‘লিভ্‌-টুগেদার’ করে। বিশ্ব-সমাজে অবক্ষয়ের সূচনা!

একটা সময় ছিল জাপানে অবৈধ শ্রমিকেরা এসে টাকা দিয়ে জাপানী মেয়ে বিয়ে করত। পঞ্চাশ বৎসর বয়সের নারীকেও পঁচিশ বৎসরের যুবক নির্দ্বিধায় বিয়ে করে ফেলত। তখন জাপানে ‘বাবল ইকোনমি’র যোগ। একই সময়ে কিছু চতুর জাপানী ‘ম্যাচ মেকিং’ কোম্পানীর জন্ম হল। কোরিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড এর নারীরা কাজ করতে এসে ভিসা ‘অভার ষ্টেয়িং’ হলে জাপানীদের বিয়ে করে বৈধ হত।  যারা ব্যর্থ হত তাদের ধরে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ দেশে পাঠিয়ে দিত।

সাতো সানের স্ত্রীর সাথে তালাকটি তার জীবনের বিয়োগাত্বক একটি কাহিনী। আমি লোকটার অন্তর দেখেছি। তার এপার্টমেন্টটি দু’তলা বিল্ডিংটির দক্ষিণ পাশে। যেদিন হাঁটতে বের হই সেদিন কুকুরগুলি ডাকাডাকি করে। এই ডাকাডাকির অর্থ আমি বুঝি। কারণ, এক সময়ে আমিও তিনটি সংকর জাতের কুকুর পালতাম। তাদেরকে দিনে একবার না হাঁটালে গোস্বা করত। শত ব্যস্ততার মাঝেও যথা সম্ভব আমি সেগুলি সঙ্গে নিয়ে হাঁটতাম। কুকুরের হায়াত বার কি তের বৎসর। তখন কুকুর তিনটি সঙ্গে নিয়ে হাঁটার তাগদ আমার দেহে ছিল। সময়ের প্রবাহে নিমেষে তের বছর ফুরিয়ে গেল। কুকুরগুলি মারা গেল। আমার মাথার চূলগুলি বর্ণ পরিবর্তন করল এবং কিছু ঝরে গেল। এখন কুকুর পালার সখ যে হয় না তা নয়। নতুন করে কুকুর ছানা কিনে আনলে সেগুলির আগেই হয়তো পৃথিবীতে আমার সময় ফুরিয়ে যাবে। তাই কুকুর পালি না। আমার বন্ধু ক্যাপ্টেন তানি ৭৬ বৎসরে মৃত্যু বরণ করেছেন। তার ঘরে দেখেছি বড় সুন্দর একটি ফ্রেমে বাঁধাই করা একটি এনলার্জ করা লুমযুক্ত ছোট একটি বিদেশী কুকুরের ছবি। তানি বলতেন, “এইটি হল আমার প্রিয় কুকুরের ছবি, মারা গেছে।”

বললাম, “আরেকটি কিনে নিন।”

ক্যাপ্টেন তানি হাসলেন, বললেন, “এখন কুকুর কিনব না। কিনলে সে কুকুরের আগেই যদি আমার প্রয়াণ হয়। তখন সেটিকে কে খাওয়াবে, হাঁটাবে? তাই কিনি না।”

কুকুরকে না হাঁটালে কান্নাকাটি করে। প্রতিবেশীরা বিরক্ত হয়ে অভিযোগ করে। সে যাই হোক, আমি হাঁটতে যাওয়ার সময় সাতো সানের কুকুর দুটি আমাকে দেখে কান্নাকাটি করে। কারণ, কুকুর বুঝতে পারে যে আমি হাঁটতে যাচ্ছি। তাই আব্দারের সুরে সঙ্গে নিবার জন্য ডাকাডাকি করে। কিন্তু কুকুরগুলিকে রাস্তা থেকে দেখতে পাই না। ছাপড়া বেঁধে রেখেছে, কুকুরগুলিকে যাতে বাহির থেকে দেখা না যায় মতো করে। কিন্তু সাতো সান জানে না যে রাস্তায় কোন মানুষ হাঁটার সময় তার ঘ্রাণ পেয়ে কুকুর বুঝে ফেলে, তাই ডাকাডাকি করে।

তার সাথে পরিচয় হওয়ার পরে মনে হয় এক বৎসর কুকুরগুলি দেখি নি। এতদিন যাবত শুধু কুকুরের ডাকই শুধু শুনেছি। একদিন সাতোকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কুকুরগুলিকে হাঁটাও না?”

সে জবাব দিল, “প্রতিদিন হাঁটাই।”

সাধারণ আধ ময়লা কাপড় সে সাপ্তাহ খানেক পরে থাকে। বললাম, “কুকুরগুলিকে স্নান করাও কি?”

মস্ত একটি হাসি দিয়ে বলল, “হ্যাঁ স্যাম্পো দিয়ে সাপ্তাহে দু’দিন উষ্ণ পানিতে গোসল করাই।”

একদিন দিনের বেলায় হাঁটার সুযোগ না পেয়ে রাত ন’টায় টর্চলাইট হাতে নিয়ে সুপার মার্কেটের পথে হেঁটে গিয়ে যখন ফিরতে ছিলাম। তখন ফুটপাতে হাতে বাঁধা রশিতে দু’টি সুন্দর জার্মন ডাচ্‌হুন্ড নিয়ে সাতোকে হাঁটতে দেখলাম। কুকুর দু’টি আমাকে দেখে কুঁইকুঁই করতে লাগল। সেদিন প্রথম দেখলাম সাতোর দুটি কুকুর। সত্যই সে কুকুর দু’টিকে যত্ন করে পালে। তার স্ত্রীর সাথে তালাক হওয়ার পর এই দুটি কুকুর তার পরিবার। নিজে সস্তা খাবার কিনে খেলেও কুকুরগুলিকে দামি ‘ডগ-ফুড’ কিনে খাওয়ায়। মানুষের উপর তার বিশ্বাস কম। ককুকুরগুলি যে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না – সে কথা সাতো সান জানে। লক্ষ করেছি যে তাকেও অনেকে বিশ্বাস করে না। তন্মধ্যে আমার স্ত্রীও একজন। সে তাকে বিশ্বাস করে না। বলেছে সাতো কথা দিয়ে কথা রাখে না। আমিও মাঝে মধ্যে আমার কাজে হেল্প করার জন্য তাকে ডাকি। কাজ করে দিলে টাকাও দেই। কিন্তু অনেক সময় সাতো প্রতিজ্ঞা করেও আসে নি। পরে দেখা হলে জিজ্ঞাসা করেছি, “কথা দিয়ে সেদিন কাজে আস নি কেন?”

জবাব দিল, “ভুলে গেছি, ক্ষমা করে দিন। আর এমন ভুল হবে না।”

তাই আমিও তার উপর ষোল আনা বিশ্বাস রাখি না। আমার স্ত্রী তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ নাম দিয়েছে।

যাক সে কথা। তার কুকুরের কথা বলি। কুকুর যে প্রভুভক্ত এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রাণী সেকথাটি সাতো ভালই জানে। যদিও সে অনেকের বিশ্বাস ভাজন লোক নয়। আবার সে নিজেও নিশিদা সানের মতো অনেককে বিশ্বাস করে না।

এতক্ষণ আমি নিশিদা সানের প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে সাতোর প্রসঙ্গ এনেছি। সত্যি বলতে কি সাতোর সাথে যদি আমার পরিচয় না হতো তাহলে নিশিদার ঘরের ভৌতিক ব্যাপারস্যাপার আমার জানা সম্ভব হতো না। সাতো তার পুরানো নড়বরে পঞ্চাশ সি সি’র মটর সাইকেলে রোজ নিশিদার বাড়িতে যায়। নিশিদা সাতোকে দিয়ে তার খেতের কাজ করায়। কিন্তু ঠিক মত টাকা দেয় না। এটা সাতোর অভিযোগ।

বললাম, “তাহলে তুমি কাজ কর কেন?”

বলল, “সে প্রতিদিন ফোন করে, তাই যাই।”

বললাম, “তোমার তো কোন মোবাইল ফোন নেই। ফোনে যোগাযোগ করে কেমনে?”

বলল, “বুড়ো নিশিদার জ্বালাতে মোবাইল ফোন ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছি।”

তারপর বলল, “নিশিদা বাড়িওয়ালার স্ত্রীকে ফোন করে।”

সে মহিলাকে চিনি, স্বভাবে চরিত্রে খুবই ভাল জানি। নিশিদার ফোন পেলে মহিলা দু’তলায় গিয়ে সাতোকে খবর দেন। বিরক্ত হলেও সাতোর অন্তরে নম্র একটি কোণা আছে। তাই সে নিশিদার সাথে দেখা করে। সাতোর বাসা থেকে নিশিদার বাড়ি প্রায় এক কিলোমিটার। যদি ফোন পাওয়ার পর সে না যায়, তখন বুড়ো নিশিদা তার মোটর বাইকে গিয়ে সাতোকে নিয়ে যায়।

এই শহরে উভয়ের জন্ম। একে অন্যকে আগে থেকে চিনে। আমি প্রবাসী আমার নিকট তারা নতুন। তিন বছর আগে থেকে তাদের চিনলেও অন্তর কেমন জানি না। জাপানেও ভাল ও খারাপ লোক আছে। কিন্তু এক শহরে বসবাস করেও একে অন্যকে ভাল মতো চিনে না।

অবিশ্বাসী জেনেও আমি মাঝে মাঝে তাকে দিয়ে কাজ করাই। অবিশ্বাসী মানে এই নয় যে সে চোর। দরীদ্র পরিবারে জন্ম। সে তার অতীত ভুলে নি। চেনাজানা লোকদের নিকট মাথা নিচু করে থাকে। তার মাঝে অভিমান আছে কিন্তু অহংকার নেই। পৃথিবীতে কোন মানুষই জীবনে পার্ফেক্ট নয়। সবার মাঝে কম বেশি  কিছু খুঁত থাকে।

একদিন সাতো ক্ষুব্ধ হয়ে নিশিদা সানের ব্যাপারে কিছু কথা বলল, “ সে গাড়ি কিনেছে, আমাকে বলে ড্রাইভ করে এদিক সেদিন ঘুরাতে, কিন্তু টাকা দেয় না। আর, আজ আমাকে ডেকে নিয়ে বলল যে আমি নিয়মিত ড্রাইভ করতে যাই না। তাই সে তার গাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছে।”

বললাম, “তাহলে তোমার জন্য ভালই হয়েছে। তার গাড়ি সে বিক্রি করেছে তোমার তো কিছু আসে যায় না।”

“কিন্তু সে বলেছে যে আমি যাই না বলে সস্তায় গাড়িটি বিক্রি করেছে। নিশিদা সান আমার দোষ দিবে কেন? আমাকে যদি নিয়মিত টাকা দিত তাহলেই সে আমাকে দায়ী করতে পারে। তুমি জান না, নিশিদা বড় কৃপণ লোক। তার কৃপণতার কথা যদি তোমাকে যদি বলি তুমি তার সাথে কথাও বলবে না!”

সেদিন সাতোর মেজাজ শীতল করার জন্য তাকে গাড়িতে নিয়ে দূরের একটি শহরে গেলাম। তাকে লাঞ্চ খাওয়ালাম। তখন সে নিশিদার অতীত ইতিহাস বলতে লাগল।

আমাকে বলল, শহরের লেকের নিকট যে ‘বার’টি ছিল, সেটা তোমার নজরে পড়েছে, তাই না?”

“হ্যাঁ, দেখেছি। কিন্তু বেশ কয়েক বৎসর যাবত ‘বার’টি দেখছি না।”

বলল, “দেখবে কি করে। তুমি তো তার ব্যাপারে কিছুই জান না। নিশিদার দুটি পুত্র সন্তান ছিল। এখন বড়টিকে তুমি দেখেছ, ছোটটি ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আর সে জন্য খোদ বুড়ো নিশিদা দায়ী।”

সাতোর মুখে একথা শুনে বড় বিস্মিত হলাম। আমার মনে নিশিদা সানের ব্যাপারে জানার আগ্রহ বেড়ে গেল। বললাম, “কি ঘটনা খুলে বল তো শুনি।”

সেদিন সাতো যা কাহিনী আমাকে শুনাল তা নিম্নে বর্ণনা করলাম।

নিশিদা সানের দুটি পুত্র সন্তান। বড়টি কোম্পানিতে চাকুরী করত। ছোটটি তার বাবার অনুমতি নিয়ে পনের বৎসর পূর্বে লেকের পাড়ে তাদের জমিতে একটি শুঁড়িখানা (বার) করেছিল।

তখন জাপানের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই ভাল। বিক্রয় প্রচুর। ছেলেটি কিছু টাকা জমিয়ে বিয়ে করবে মনে করেছিল। একদিন সেকথা তার বাবা নিশিদাকে বলেছিল।

ছেলের কথা শুনে নিশিদা বলেছিল, “তোর বিক্রয় তো বেশ ভাল হয়। প্রতি মাসে আমাকে এক লক্ষ ইয়েন (সত্তর হাজার টাকা) ভাড়া দিতে হবে!”

ছেলেটি বলেছিল, “বাবা, তোমার টাকার কি অভাব আছে? আমি রাতে না ঘুমিয়ে বারটি চালাই। কিছু রোজগারের পথ হয়েছে বলে বিয়ে করার কথা বললাম। তুমি আমার বাবা, আমার কাছ থেকে ভাড়া নিবে?”

নিশিদা বলেছিল, “হ্যাঁ, দিতে হবে। কারণ, যে জমির উপর বার করেছ সেটি আমার!”

সেদিন ছেলেটি কিছু না বলে চলে গিয়েছিল।

বিয়ে করার কথা স্থগিত রেখে বারটি সে চালাচ্ছিল। কয়েক মাস পর ছেলেটি জানতে পারল যে নিশিদা সান দোকান ঘরটি জমি সহ বিক্রি করে দিয়েছেন।

মনে বড় ব্যথা পেয়েছিল নিশিদার সেই দ্বিতীয় ছেলেটি। একথা শুনে সে একদিন রাতে তার রুমে ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

About Golam Masum

Check Also

১০ম প্রবাস প্রজন্ম ২০১৯

Post Views: 3

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *