Breaking News
Home / নীড় / মরু-হীরক ফাগা

মরু-হীরক ফাগা

বহুকাল অপেক্ষার পর ইয়েমেনের বর্ডার থেকে এসেছে ছোট এক কার্টুন দুর্মূল্য ফাগা, দেখতে আছড়ানো আলুর মতো, আদৌ চিত্তাকর্ষক নয়। কিন্তু মাংসের সঙ্গে রান্না করার পর মনে হলো, পৃথিবীর কোনো খাবারকে যদি স্বর্গীয় খাবার আখ্যা দিতে হয় তবে একেই দেয়া উচিত। যে ব্যক্তি জীবনে কখনো ফাগা মুখে তোলেনি তাকে এর স্বাদ কিছুতেই বোঝানো সম্ভব নয়। ফাগা রাজকীয় খাবার, এর ব্যবহার ফেরাউনি আমলেও ছিল। মিশরীয় মন্দিরে হাইরোগ্লিফিকস্‌ বর্ণমালায় লিখিত কবিতায় ফাগার উপর আরোপিত হয়েছে কিছু কথা, ভাবানুবাদে যা প্রায় ধাঁধার মতো…

“নেই পাতা, নেই কুঁড়ি, পুষ্পবিহীন
তবু তারে দেখি ফলরূপে, খাবারে ওষুধে
এ কেমন সৃষ্টি, সীমাহীন!”

রাণী এলিজাবেথ ও চার্চিলের প্রিয় খাবার ছিল ফাগা। সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে যা ‘ফাগা’ বা ‘কামা’ নামে সমধিক পরিচিত ইংরেজিতে তা ‘ট্রাফল্‌’ (Truffle)। দেখতে মাশরুমের মতো কিন্তু ডাঁটা নেই। মাশরুম ও ফাগা উভয়েই ছত্রাক, মাশরুম জন্মে ভূমির উপরে আর ফাগা জন্মে ভূমির নিচে। রাজা-বাদশা্দের খাবার এসব ফাগা রোমান আমলে এক সময় লিবিয়া থেকে আমদানি করা হতো যার কিছু বিক্রি করা হতো দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোতে।

আরব দেশগুলোতে ফাগার পোষাকি নাম ‘বজ্র-কন্যা’। ঊষর মরু, যেখানে গাছপালা নগন্য সেখানে বালির উপরেও বজ্রপাত হয়। এক পশলা বজ্র-বৃষ্টির পরই ফাগার জন্ম হতে দেখা যায় যার জীবনচক্র কিছুদিনের ভিতরেই শেষ হয়ে যায়। ফাগার গোপন অবস্থান কোথায় তা বংশানুক্রমিক অভিজ্ঞতা না থাকলে বুঝে ওঠা মুশকিল, কারণ এগুলো থাকে মাটির চার-ছয় ইঞ্চি নিচে। যেখানে ফাগা জন্মে সেখানে মাটি চির ধরে এবং একটু উঁচু হয়ে যায়। এই উচ্চতা এতো নগন্য যে তা সহজে চোখে পড়তে চায় না। ফাগা সংগ্রহকারী বেদুইন খুব ভোরবেলা সূর্য ওঠার সময় এবং কখনো কখনো সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার সময়, আনুমানিক ফাগা এলাকায় গিয়ে অপেক্ষা করে একটি বিশেষ মুহূর্তের জন্য। ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে সূর্যরশ্মি আনুভূমিক হওয়ার কারণে ফাগার উপরকার উঁচু হয়ে ওঠা মাটির কালো ছায়া পড়ে যা খুব তাড়াতাড়ি সে পাথর দিয়ে চিহ্নিত করে ফেলে। বেশ সাবধানে, একটু একটু করে বের করতে হয় ফাগা। প্রায়শ ফাগাকে খুঁড়ে বের করা হয় কাঁটাচামচ দিয়ে, কারণ ফাগার ফাটলে অনেক সময় বিষাক্ত বৃশ্চিক (Scorpion) থাকে। কালো বৃশ্চিক দেখতে ভয়ঙ্কর হলেও বেদুইনের ভয় সাদাটে-ধূসর বৃশ্চিককে যার হুল অনেক বেশি বিষাক্ত। আচম্বিতে এই হুল ফুটে গেলে তাকে দৌড়াতে হয় আকন্দ গাছের কষ লাগানোর জন্য। এতসব কষ্টের মধ্যে ফাগা উদ্ধার করা বেদুইনের জন্য এক পরম প্রাপ্তি, মাত্র একটি ফাগা বিক্রি করলেই হয়ত তার কয়েকদিনের অন্ন-সংস্থান হয়ে যায়।

সীমিত বিভাজনে আরবের ফাগা দুরকম, কালো আর সাদা, ইখ্‌লাসি (Terfezia claveryi, Terfezia boudiere) ও জুবাইদি (Tirmania nivea)। এ ছাড়াও আরেক ধরনের ফাগা দেখা যায় যা ‘ফাগা আল তইয়ুর’ বা ‘পাখি-ফাগা’ নামে পরিচিত, কারণ এগুলো কেবল পাখিরাই খুঁজে বের করে খেতে পারে। ইখলাসি ফাগা কিছুটা ওভাল আকৃতির, ভেতরটা থাকে গোলাপি রঙের আর জুবাইদি ক্রিম রঙের, বাইরে এবং ভেতরেও। ভূমধ্যসাগরের চারদিক ঘিরে এসব ফাগার আস্তানা, লিবিয়া, মিশর, তিউনিসিয়া, মরক্কো, আলজিরিয়া, সিরিয়া, জর্দান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব, ফ্রান্স, স্পেন এবং ইটালিতে। আকালের সময় এক কিলো উৎকৃষ্ট মানের ‘জুবাইদি’ ফাগার মূল্য প্রায় ২৫,০০০ টাকা। ইতালীয় ফাগা বা ট্রাফল্‌-এর মূল্য অবিশ্বাস্য, আরবি ফাগার কমপক্ষে ২০ গুন।

ফাগা সংগ্রহে কিছু অতিরিক্ত ঝক্কি আছে। কুয়েতের ফাগা এলাকাগুলো উপসাগরীয় যুদ্ধের পর মাইন অধ্যুষিত হয়ে পড়েছে। তাই অন্বেষণকারীরা নেশাকর এবং দুর্মূল্য ফাগার সন্ধানে বর্ডার ডিঙিয়ে সৌদি আরবের ভেতরে ঢুকে পড়ে। পৃথিবীর অন্যতম ফাগা সংগ্রহ এলাকা মিশরে রয়েছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কার বালিতে পোঁতা ২৩ লক্ষ মাইন, সারা পৃথিবীতে এখন যার সংখ্যা ২২ কোটি। আফগানিস্তান ও ক্যাম্বোডিয়ায় ল্যান্ড-মাইনের যন্ত্রণায় কৃষি উৎপাদন অর্ধেক হয়ে আছে। এসব অক্ষয় মাইন সরাতে খরচ হবে মাইনের দামের ৫০ গুন, সময় লাগবে হাজার বছর কিংবা আরো অনেক বেশি কারণ মাইনের উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। পরিসংখ্যান দেখলে মনে হয়, আমাদের জীবনে এখন ‘মাইন পলিউশান’ নামে আরেকটি দুষণ যোগ হয়েছে, যার নিরাময় নেই কেয়ামত পর্যন্ত।

ইউরোপীয় দেশগুলোতে ফাগা সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা হয় শূকর বা কুকুর। ফাগা থেকে বংবিস্তারের নিমিত্তে যে স্পোর তৈরি হয় তা থেকে বের হয় একপ্রকার উৎকট খাদ্যগন্ধ যা কিছু প্রাণীকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। শূকর ও কুকুর উভয়েই ফাগা সনাক্ত করতে সক্ষম। শূকর সুযোগ পেলেই ফাগা ভক্ষণ করে, এর জন্য শেষ মুহূর্তে বাধা দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়, কিন্তু সনাক্ত করার পর কুকুর কখনো ফাগা খায় না। প্রাক-ইসলামিক যুগে ফাগা উত্তোলনের জন্য আরব দেশগুলোতে শূকরের ব্যবহার হয়ে থাকবে, এখন আর এই প্রাণীর ব্যবহার এতদঞ্চলে নেই। ফাগা সংগ্রহের জন্য পৃথিবীতে মাত্র কয়েকটি কোম্পানি আছে যার ভেতর আছে ‘আরবানি’ যা প্রায় ৭০ শতাংশ বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এরা ফাগা তোলার জন্য উচ্চপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ব্যবহার করে। ফাগা তুলে নেয়ার পর একে বেশিক্ষণ রাখা যায় না, দ্রুত নষ্ট হতে থাকে, তাপ এবং আর্দ্রতা উভয়েই এর জন্য ক্ষতিকর। ফ্রিজে একে রাখা যায় না। প্রায়ান্ধকার ঘরে হালকা ঠাণ্ডা বাতাসে এর জীবন কিছুটা দীর্ঘায়িত করা যায় মাত্র।

ফাগার ভেতরে পাওয়া যায় সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, লোহা, তামা দস্তা, এমিনো এসিড ইত্যাদি মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় বহু খনিজ ও রসায়ন। বয়স নিরোধক ও লিভারের রোগ প্রতিরোধক হিসাবে, শ্বেতপ্রদর, মাম্পস্‌ ও হার্টের অসুখ সারানোর কাজে এর ব্যবহার চলে এসেছে বিভিন্ন উপজাতীয় মানুষের মাধ্যমে, বংশপরম্পরায়। আরব দেশগুলোতে এর একটি বিশিষ্ট ব্যবহার আছে, কিছু চোখের অসুখ ভাল করার জন্য যার জন্য ব্যবহার করা হয় ফাগার পানি। এই পানি সংগ্রহ করার জন্য ফাগার মুখে গর্ত করে একটি পাত্রের মতো করা হয়। এরপর অঙ্গারের উপর বসিয়ে রাখলে গর্তটা জলে ভরে যায়, তখন তা অন্য পাত্রে ঢেলে নেয়া হয়, যা করা হয় কয়েকবার। এরপর রোগীর চোখে প্রয়োগ করা হয় ফোঁটা ফোঁটা করে। আধুনিক বেদুইনদের অনেকে অবশ্য এসব কাজের জন্য এখন প্লাস্টিকের সিরিঞ্জ ব্যবহার করে। চোখ-ওঠা চিকিৎসার জন্য আরবদের ভিতর স্তনদুগ্ধ ব্যবহারের রীতি ছিল অনেক আগে যা অবলোকন করেছিলেন খ্যাতনামা ব্রিটিশ আবিষ্কারক ও পর্যটক ‘সেন্ট জন ফিলবি’ যিনি ছিলেন কেম্ব্রিজে পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহেরুর সহপাঠী। তাঁর বর্ণনায় দেখা যায় এই চিকিৎসার জন্য মাতৃদুগ্ধ কেবল আপন সন্তানের জন্যই বেশি উপযোগী।

যুগ যুগ ধরে মানুষ ফাগা আবাদ করার চেষ্টা করেছে, কখনো তেমন সফল হতে পারেনি নানা কারণে। এদের জীবনচক্র বেশ জটিল। ফাগার জন্য চাই ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর পরিবেশ, উষ্ণ গ্রীষ্মকাল, পরম শৈত্য ও সময়মতো বিশেষ পরিমাণ বৃষ্টিপাত। কিছু কিছু গাছের সঙ্গে এদের রয়েছে লেনদেন সম্পর্ক, এক নিবিড় মিথোজীবী আচরণ। বৈজ্ঞানিক শর্তে এরা একধরনের মাইকোরাইজ্যাল ছত্রাক বা সূক্ষ্মতর অর্থে এক্‌টো-মাইকোরাইজ্যাল ছত্রাক (Ectomycorrhizal fungus, ECM)। অংশীদার গাছ থেকে ছত্রাক পায় শ্বেতসার-শর্করা জাতীয় খাবার, বিনিময়ে গাছের শিকড়ে জল ও পুষ্টি সংগ্রহে সহায়তা করে এরা। এই মিথোজীবী আচরণকে উপলব্ধি ও বিশ্লেষণ করে ওক্, ঝাউ, হেজেলনাট ইত্যাদি গাছের শেকড়ে ফাগা জন্মানো সম্ভব হয়েছে। আরব মরুতে যে আশ্রয়দাতা গাছের সঙ্গে ‘জুবাইদি’ ফাগার (Tirmania nivea) সম্পর্ক সেটা এক প্রকার সৌর-গোলাপ (Helianthemum salicifolium)।

ওক্‌ গাছের শিকড়ে ফাগা উৎপাদনের সাফল্য কিন্তু দীর্ঘায়িত হতে পারেনি। গোটা ইউরোপে এক সময় যখন ‘ফিলোক্সেরা’ পোকার আক্রমণে আঙুরবাগানের অস্তিত্ব লোপ পেতে যাচ্ছিলো তখন আঙুর ক্ষেতে লাগানো হয়েছিল প্রচুর ওক্‌ গাছ যার শিকড়ে চাষ হয়েছিল ফাগা ছত্রাকের। এটা ছিল ফাগা উৎপাদনের স্বর্ণযুগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অধিক মুনাফার জন্য দানা শস্যের চাষে সার প্রয়োগ ও কীটনাশকের ব্যবহার শুরু হয়। ফাগার জন্য এটা ছিল এক ভীষণ প্রতিকূল অবস্থা, যে-কারণে ১০০ বছর আগের বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০০০ টন থেকে নেমে এসেছে ৩০ টনে (CBS News, 2012)। আমেরিকার মাটিতে ইউরোপের ফাগার মতো ঘ্রাণসমৃদ্ধ ফাগা চাষ করা এখনো সম্ভব হয়নি, কারণ ইউরোপীয় লাল মাটি ও বৃষ্টিবহুল গ্রীষ্ম পরিবেশ তৈরি করা বেশ কঠিন কাজ। তবু বর্তমানে ‘বায়োপ্রসেস টেকনোলজি’ অনেক উন্নত হয়েছে, গ্রিনহাউসের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা বেড়েছে, অল্প সময়ে ‘বায়োথেরাপিউটিক কম্পাউন্ড’সহ অনন্য ছত্রাক ফাগা উৎপাদনে সাফল্য আসবে সন্দেহ নেই। এই সাফল্যের ভাগীদার পৃথিবীর বহুদেশ হতে পারে এমন কি প্রগতিশীল উপমহাদেশীয় দেশগুলোও।
.
ছবি
১ মরু ফাগা- সূত্রঃ মোর্তজা ভিফার
২ কালো এবং সাদা ফাগা- সূত্রঃ ট্রাফল্‌ ডগ কোম্পানি
৩ ফাগা শিকারে কুকুরের ব্যবহার- লরা ডার্ট, ওরিগন
৪ জুবাইদি ফাগার হোস্ট প্ল্যান্ট সৌর গোলাপ
সূত্রঃ … জায়েদ ফরিদ, ফ্লোরেস
সিলভেস্ট্রেস ডি হরমাজা

About GIT-support

Check Also

নতুন গ্রহ

ভারতের মহাকাশ বিজ্ঞানীরা দাবী করেছেন, এতদিন নিশ্চিন্তে সকলের অজান্তে এই গ্রহটি প্রদক্ষিণ করে চলেছিল তার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *