Breaking News
Home / খোলাকলম / জাপানীরা কেমন :পর্ব–৩০ ডঃ আরশাদ উল্লাহ

জাপানীরা কেমন :পর্ব–৩০ ডঃ আরশাদ উল্লাহ

Arshadullah

ডাঃ ইছোয়ে তার পেশা ছেড়ে দিয়ে ব্রাজিল গিয়ে ভাল কি খারাপ করেছেন তখন আমরা ভাবতে পারিনি। কিন্তু আমি কেনো জানি জানিনা – তাকে মন থেকে সমর্থন দিতে পারলাম না। তার মা বাবার কথা ভেবে একদিন তার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ডাঃ ইছোয়ে জবাবে বললেন, ‘তাঁরা বলেছেন, ‘সে পথে গিয়ে যদি তুমি সুখি হও – যেতে পার!’
তাই ডাক্তার ইছোয়ে তার ইচ্ছার পথেই গেলেন। তিনি তার ডাক্তারি পেশা ছেড়ে দিলেন। জাপানে একটি পরিবারে একজন ডাক্তার থাকলে ষ্টেটাস অনেক বেড়ে যায়। ডাক্তার হওয়া মানে বেহেস্তি মেওয়া হাতে পাওয়া।
জাপানে সব চেয়ে মোটা অংকের রোজগার করেন একজন ডাক্তার। এমন একটি উত্তম পেশা ডাঃ ইছোয়ে ছেড়ে দিয়ে জাপানের এক ফ্যাকটোরিতে কর্মরত ছত্রিশ বৎসর বয়স্ক ব্রাজিলের একজন বিধবাকে বিয়ে করে সুদূর ব্রাজিল চলে গেলেন। ছুটির দিনে সাপ্তাহে একদিন তিনি আড্ডা দিতে আসতেন। তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতেন। আমার সাথে তিনি তার অতি গোপনীয় কথাটি বলেছেন, যা তিনি দ্বিতীয় কোন ব্যক্তিকে বলেন নি। সেদিন ডিনার শেষে আমার স্ত্রী দু’তলায় টিভি দেখতে যাওয়ার পর । ড্রয়িং রুমে আমরা দু’জন রাত বারটা পর্যন্ত কথা বলেছি। ডাঃ ইছোয়ে তার অন্তরের লুকায়িত বেদনার শক্ত পাথরটির ভার লাঘবের জন্য সেদিন অন্তরের সবকিছু আমাকে বললেন। জাপানে তার অনেক বন্ধুবান্ধব রয়েছে, সে তাদের নিকট তার একান্ত নিজস্ব গোপন কথাটি এতদিন বলেন নি। আমি একজন প্রবাসী বলেই হয়তো তিনি বলেছেন। সে কথা ছিল তার একান্ত নিজস্ব ব্যাপার।
জাপানে ট্রেনে, বাসে করে যেতে অথবা শহরে নগরে হাজার মানুষের মুখের দিকে তাকালে মনে হবে সবাই সুখি। কারো পরনে ময়লা কাপড় নেই, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পৃথিবীর অন্যতম ধনী সভ্য দেশের লোকেরা হয়তো সবাই সুখে আছে – এমন ধারণা তৃতীয় বিশ্বের লোকেরা হয়তো মনে করেন। আসলে সে ধারণা ঠিক নয়; সবাই সর্বত্র সুখি নয়। সুখ এবং দুঃখ সর্বত্র পাশাপাশি পৃথিবীর আনাচেকানাচে দৌড়াচ্ছে। ধন দৌলত সবাইকে সুখি করতে পারে না। মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থলে রয়েছে জীবনের চাওয়া না পাওয়া সুখ দুঃখের সাদা-কালো অসংখ্য ক্ষতের দাগ। সেগুলি কোটি কোটি টাকাতেও মুছা যায় না। সচ্ছল পরিবারের সন্তান হয়েও ডাঃ ইছোয়ের মনে কোন এক সুখের স্বপ্ন পূর্ণ হয় নি। তাই সে বেদনা তাকে সর্বক্ষণ তাড়া করে বেড়াচ্ছে। যা না কি ইছোয়েকে অপ্রাপ্তির বেদনার সাগরে নিক্ষেপ করেছে। সেই সাগরে কাতর হয়ে অন্ধকার সাগরে সে সাঁতরাচ্ছে। কিন্তু কোথাও কোন কুল-কিনারা পায় নি। তাই আজ ডাঃ ইছোয়ে তার মনের অতি দুর্বলতম দুঃখের কথাটি বলা শুরু করলেন।

জাপান

বললেন, “ আমি আমার সহপাঠী একটি মেয়েকে ভালবাসতাম। মেডিক্যালে একই সময়ে ভর্তি হয়েছি এবং একই সালে ডাক্তার হয়ে বের হয়েছি। মাদের দু’জনের মনের মিলনে ভালবাসার একটি অঙ্কুরের জন্ম হল। আমরা প্রেমে পড়লাম। দু’জনে প্রতিজ্ঞা করলাম যে ডাক্তার হওয়ার পর বিয়ে করবো। দিনরাত পড়াশুনা করে দীর্ঘদিনের সাধনা পূর্ণ হল এবং উভয়ে ডাক্তার হলাম। তাকে আমার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম এবং আমার মা বাবার সাথে পরিচয় করিয়েছি।”
ডাঃ ইছোয়ের জন্ম জাপানের দক্ষিণাঞ্চল শিকোকু বিভাগে। সাইতামা বিভাগ থেকে এক হাজার কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। সে গ্রীষ্ম কিংবা শীতের ছুটিতে গাড়িতে করে প্রেমিকাটিকে তার বাড়িতে নিয়ে যেতো। অনেক সময় হোটেলেই থাকতো। ইছোয়ে বললেন, “দীর্ঘ ছয় বৎসর আমাদের প্রেমে কোন ক্ষতের সৃষ্টি হয় নি। নিখুত এবং নিখাদ ছিল আমাদের ভালবাসা। সমস্যা দেখা দিল ডাক্তার হওয়ার পর। মেয়েটি আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছে এবং তার মা বাবার নিকট পরিচয় করিয়েছে। তার বাড়িতে অনেকবার আমি গিয়েছি। আমরা বিয়ে করব যখন সিদ্ধান্ত নিলাম, তখন তার ডাক্তার বাবা বিয়েতে বাঁধা দিলেন। তার বাবার একটি ক্লিনিক আছে!”
ডাঃ ইছোয়ে হ্যান্ডসাম পাত্র, দেখতে দীর্ঘদেহি এবং সুন্দর। এমন একটি পাত্রকে কেন যে মেয়েটির ডাক্তার বাবা অবহেলার চোখে দেখলেন তা আমার বোধগম্য হল না। মেয়েটি ডাক্তার, সে তার পছন্দের ডাক্তার পাত্রকে বিয়ে করলে তো সোনায় সোহাগা হবে। এখানে তো বৈষম্য থাকার প্রশ্ন উঠে না। জাপানের মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ও মেয়েরা নিজেদের পছন্দ মতো বিয়ে করে। সে ক্ষেত্রে তাদের মা বাবারা বিশেষ কোন বাঁধার সৃষ্টি করেন না। কিন্তু ডাঃ ইছোয়ের বেলাতে অস্বাভাবিক এক বৈষম্যের দেয়াল সৃষ্টি হল। যা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। হ্যাঁ, জাপানে এমনও হয় এবং তা অনেকের চোখে পড়ে না।
জাপানী সোসাইটির গভীরে প্রবেশ করে কয়েক বৎসর অতিক্রান্ত না হলে তা বুঝা যায় না। একবার টোকিওর এক অভিজাত এলাকার এক ডেন্টাল সার্জনের পরিবারে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ভয়ঙ্কর এক হত্যাকান্ড হয়েছে। তা জাপানের টিভি, পত্রপত্রিকাতে ব্যাপক ভাবে প্রচার করা হয়েছে। সেই ঘটনার পর আমি জাপানী সোসাইটির উপর আরো অনুসন্ধিৎসু হয়েছি।
ঘটনাটি ছিল, টোকিওর একটি অভিজাত এলাকাতে একজন দন্তচিকিৎসকের একটি ক্লিনিক আছে। তার এক কন্যা সন্তান ও একটি ছেলে ছিল। ছেলেটি সিনিয়ার হাই স্কুলের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র এবং মেয়েটি ভার্সিটিতে পড়ে। একদিন খাবার টেবিলে তারা সবাই যখন ডিনার খাচ্ছিল তখন মেয়েটি বলল যে সে মুভি একট্রেস হতে চায়। তার কথার জবাবে তার বাবা বললেন, “সেটা ভাল পেশা নয়। তুমি একট্রেস হও তা আমি চাই না! সে পেশা আমাদের আভিজাত্যের পরিপন্থী হবে!”
বাবার কথায় একমত হল পুত্র সন্তানটি। সে তার বড় বোনকে সে পেশা নেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলল। কিন্তু তার বোনটি তীব্র প্রতিবাদ করে বলল, “তা আমার ইচ্ছা। সে পেশাতে আমি সুখী হব!”
এভাবে কিছুদিন তর্কাতর্কি চলার পর কোন এক রাতে ছেলেটি তার বড় বোনকে ঘুমের মধ্যে চাকু দিয়ে হত্যাকরে মৃত দেহটিকে করাত দিয়ে কেটে কয়েক টুকরো করে রেখে পুলিশকে ফোন করল। তারপর পুলিশ এসে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। এই জঘন্য কথা দেশব্যাপি ছড়িয়ে পড়ল।
এই ঘটনার পর জাপানের প্রথম শ্রেণীর নাগরিকদের মাঝে যে আভিজাত্যের মারাত্মক ক্রিয়া বিদ্যমান সে ব্যাপারে জ্ঞাত হলাম! তৎপূর্বে আমার একটি ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে শতভাগ শিক্ষিত এই আধুনিক একটি সমাজের মধ্যে এমনতর কুৎসিত আভিজাত্যের সংস্কৃতি থাকতে পারে না।
ডাঃ ইছোয়েও এমন একটি অস্বাভাবিক অপসংস্কৃতির দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির সন্মুখিন হলেন। যাকে বলা হয় নিয়তি। এখানে তার প্রেমিকার পিতা বড় একটি বাঁধা হয়ে আবির্ভূত হলেন। একটি সুদর্শন ডাক্তার পাত্রের নিকট তার কন্যাকে বিয়ে দিবেন না বললেন। শুধু তাই নয়, তিনি ডাঃ ইছোয়ের কঠোর সমালোচনা করে বললেন, “ অস্থির চিকিৎসকের সন্তান হয়ে কেমন করে তুমি একজন ডাক্তারের মেয়েকে বিয়ে করার চিন্তা কর?!”
অস্থির চিকিৎসা বিজ্ঞানকে ইংলিশে Orthopedic বলে। ইছোয়ের বাবা একটি Orthopedic Clinic পরিচালনা করেন। তা কন্যার বাবার মেডিক্যাল ক্লিনিক এর চেয়ে নিম্নশ্রেণীর মনে করছে। যদিও ইছোয়ের বাবার ক্লিনিকটি অত্যন্ত জমজমাট ব্যবসা করছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা কন্যার বাবার চোখে নিম্ন ষ্ট্যাটাসের। তাই তার নিকট নিজের মেয়ের বিয়ে দিবে না। তাদের মাঝে যে গভীর প্রেম অঙ্কুর থেকে বৃদ্ধি পেয়ে পূর্ণাংগ বৃক্ষে পরিণত হয়েছে – সেদিকে এই আত্ম-অহংকারি ডাক্তারটি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন নি।
সমাজে কিছু লোক রয়েছে তারা সংকীর্ণ চেতনার অবস্থানে থেকে পাহাড় আর পর্বত যে ভিন্ন কিছু নয় – তা বুঝতে চায় না। ডাঃ ইছোয়ের ব্যাপারেও এমনটি হয়েছে। কঠিন পড়াশুনার মধ্যে ডুবে থেকে ডাক্তার হয়ে নীল আকাশের গভীরতার পরিমাণ যখন তার দু’চোখে দেখার চেষ্টা করছেন তখন তার মনে হল যে হঠাৎ পিছন থেকে কেউ ধাক্কা দিয়ে তাকে পর্বতের চূড়া থেকে অশান্ত সুমদ্রে ফেলে দিয়েছে।
মনে বড় আঘাত পেলেন ডাঃ ইছোয়ে। অপমানিত হয়ে তিনি তার প্রেমিকার দিকে তাকালেন। প্রেমিকাটি নিশ্চুপ বসে আছে। মনে হল গভীর চিন্তায় সে মগ্ন। তার বাবার কথার প্রতিবাদ করতে চেয়েও কোন কারণে তা করতে পারল না। এমন সময়ে প্রেমিকার ডাক্তার বাবাটি মেয়েকে লক্ষ করে বললেন, ‘তোমার জন্য ভাল পাত্র আমি দেখে রেখেছি। তুমি তাকে ভুলে যাও!’

রিও, ব্রাজিল

সেদিন ইছোয়ে তার এপার্টমেন্টে ফিরে এসে প্রেমিকাকে ফোন করেছিল এবং কিছু কথাও হয়েছে। কিন্তু প্রেমিকা তাকে জানাল যে তার বাবার মতের বাইরে কিছু করতে পারবে না।
অনেক কষ্টে ডাঃ ইছোয়ে তার মনকে প্রবোধ দিল। কিন্তু প্রেমিকার বাবার প্রতি তার মনে প্রচন্ড ঘৃণা জাগল। সে প্রতিজ্ঞা করল যে একদিন সে প্রেমিকার বাবার চেয়ে অনেক বড় কিছু হয়ে দেখাবে। তারপর কোন এক সময়ে গিয়ে সেই ডাক্তারের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলবে, “দেখুন, আমার অবস্থান আপনার চেয়ে অনেক উপরে এবং যে অবস্থানে আমি এখন আছি সে অবস্থানে আপনি কিছুতেই যেতে পারবেন না!”
তার প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গেছে, ইছোয়ে তা জানে। সে জন্যে সে আর ক্ষুব্ধ নয়। প্রেমিকার উপরে নয়, সে তার বাবার উপর বেশি ক্ষুব্ধ। এখন চিন্তা করতে লাগলেন কেমনে এবং কি করলে বিখ্যাত কিছু হতে পারবেন। রাতদিন চিন্তা করে একটি সঠিক পথ বের করার চেষ্টা করে সিদ্ধান্ত নিলেন যে মেডিক্যাল কলেজের প্রফেসর হবেন এবং তা হলেই বদলা নেওয়া যাবে।
ইছোয়ে একই মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তার হয়ে যোগদান করে কাজ করতে লাগলেন। কিন্তু একদিন ভেবে দেখলেন যে প্রফেসর হতে হলে তাকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে। অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে যেতে হবে। একথা ভাবতে ভাবতে একদিন তার মনে এক ধরণের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হল। ইছোয়ে জাপানী মেয়েদের উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস হারিয়ে ফেললেন। প্রতিজ্ঞা করলেন কোনদিন জাপানী মেয়ে বিয়ে করবেন না। মনেমনে সিদ্ধান্ত নিলেন স্পেনের মেয়ে বিয়ে করবে্ন। তারপর স্পেনের ভাষা মনোযোগ দিয়ে শিখতে লাগলেন। শুধু তাই নয়। স্পেনের মেয়ে বিয়ে করে তিনি জাপানে থাকবেন না। স্পেনে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে্ন। একটানা তিন বছর কাজ করে ত্রিশ মিলিয়ন ইয়েন ( তিন কোটি টাকা ) জমালেন। এখন তিনি সর্বক্ষণ স্পেনে চলে যাওয়ার কথা ভাবতে লাগলেন। ঠিক এই সময়ে মিঃ কাতো এসে ব্রাজিলের বিধবা মহিলার কথা বললেন।
ব্রাজিলের লোকেরা দুটি ভাষায় কথা বলে। স্পেনিশ এবং পর্তোগিজ ভাষাতে। এই দুটি ভাষার মধ্যে মিল রয়েছে, হিন্দি এবং বাংলার মতোই। ছত্রিশ বৎসর বয়সের সুন্দরী বিধবা স্প্যানিশ ভাষাতে কথা বলে। তাই ডাঃ ইছোয়ে ভালমন্দ কিছু না ভেবে সে মহিলাকে বিয়েকরে ব্রাজিল চলে গেলেন! ( চলবে )

ডঃ আরশাদ উল্লাহ
জাপান প্রবাসী গবেষক লেখক ও কবি

About Golam Masum

Check Also

Tokyo Boishakhi Mela 2019

Post Views: 9

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *